Thursday, April 27, 2017

বলাকা ১৯১৬ সালে রচিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গতিচেতনা বিষয়ক কাব্য।

 কাব্যটি রবীন্দ্র কবি মানসের বিবর্তন ধারাপথে আত্মপ্রকাশ করেছে। প্রাক্বলাকা কাব্যে কবির অনুভূতি আবেগের মধ্যে দিয়ে ব্যক্ত ছিল, কিন্তু বলাকা কাব্যে সেই অনুভূতির প্রকাশ হয়েছে বোধি ও বুদ্ধি, জ্ঞান ও অনুভবে এবং দ্রুতি ও দীপ্তির মাধ্যমে- বিষয়ের সঙ্গে একাত্মতায় ও নতুন চেতনায়। কাব্যটি রচনার পশ্চাতে তিনটি বিষয় কবিকে অনুপ্রাণিত করেছে; ক. কবির ইউরোপ ভ্রমণ, খ. কবির নোবেল পুরস্কার লাভ, গ. সমকালীন বিশ্বপরিস্থিতি ও প্রথম মহাযুদ্ধ। ১১ মে ১৯১২ সালে কবি সম্ভবত: তৃতীয়বারের মতো ইউরোপ যাত্রা করেন। ইংল্যান্ডে চার মাস থেকে গেলেন আমেরিকায়, সেখানকার নিউইয়র্ক, আর্বানা-শেম্পেন, শিকাগো, বোস্টন, কেমব্রিজ প্রভৃতি স্থানের মনীষী, সাধারণ মানুষ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পন্ডিতদের সংস্পর্শে আসেন। ইউরোপ ও আমেরিকার নবজীবন প্রবাহ, প্রাণশক্তি ও আভ্যন্তরীণ আত্মিক শক্তি এবং আমেরিকাবাসীর বিজ্ঞান-রাষ্ট্র-সমাজচিন্তা তাঁর চিত্ত ও চেতনায় প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ফলে প্রতিভার সঙ্গে কবি মানসে সঞ্চারিত হলো গভীর এক অনুপ্রেরণা। দ্বিতীয়ত নোবেলপ্রাপ্তীর ফলে প্রাচ্য জীবনচেতনার গুরুত্ব ও গৌরব বিশ্বসভায় ও বিশ্বের মনীষীদের কাছে মূল্যায়ন হয়েছে-এই নব উপলব্ধি কবিকে নতুন প্রাণশক্তিতে উদ্বোধিত করেছে। তৃতীয়ত সমকালীন বিশ্বপরিস্থিতি ও প্রথম মহাযুদ্ধ। তাছাড়াও কবি মনে করেন-‘আমরা মানবের এক বৃহৎ যুগসন্ধিতে এসেছি, এক অতীত রাত্রি অবসান প্রায়। মৃত্যু, দুঃখ ও বেদনার মধ্য দিয়ে বৃহৎ নবযুগের রক্তাভ অরুণোদয় আসন্ন। সেজন্য মনের মধ্যে অকারণ উদ্বেগ ছিল।’
আলোচ্য কাব্যে মোট ৪৫টি কবিতা রয়েছে; ১০টি সমপঙক্তিক আর ১টি সনেট আকারবদ্ধ। অবশিষ্ট ৩৪টি বিষম ছন্দে রচিত এবং উক্ত ৩৪টি কবিতার ছন্দকেই ‘বলাকার ছন্দ’ বলা হয়। কাব্যটিতে কবি যেসব বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন-ক. নিসর্গ প্রকৃতি ও বিশ্ব প্রকৃতি এ দুটি রূপকে কবির প্রকৃতিচেতনা প্রকাশিত হয়েছে, খ. ‘চঞ্চলা’ ও ‘বলাকা’ কবিতা দুটিতে কবির বিশ্ব প্রকৃতিগত গতিচেতনার পরিচয় রয়েছে আর কবির নিসর্গ-প্রকৃতি তাঁর বিপ্লব চেতনার পরিপোষকরূপে রয়েছে ঝড়ের খেয়া কবিতা, গ. ৪১ ও ২৬ সংখ্যক কবিতা দুটি খাঁটি নিসর্গ চিত্রের কবিতা; এরমধ্যে ২৬ সংখ্যকটি প্রধান, ঘ. অন্যকোনো ভাবের অনুষঙ্গরূপে বা গতিচেতনা বা জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানিক বিশ্বচেতনার অভিব্যক্তিরূপে এ কাব্যে কবি প্রকৃতিকে অবিমিশ্র নিসর্গ প্রকৃতিরূপে সামান্যই অনুভব করেছেন।
কবির জীবন-চেতনা ভাব থেকে ভাবান্তরে, রূপ থেকে রূপান্তরে প্রতিনিয়তই পরিবর্তনশীল। আলোচ্য কাব্যের প্রত্যেকটি কবিতা আলাদাভাবে এক একটি বিশিষ্ট বক্তব্যকে ধারণ করেছে; কোনো কবিতার মূল বক্তব্য নবীন-বরণ (১ সংখ্যক), কোনোটিতে মহাযুদ্ধের প্রলয়ঙ্কর পূর্বাভাস (২ সংখ্যক), কোনোটি ব্যক্তির প্রেম-প্রেরণার রূপতত্ত্ব (৬ সংখ্যক) আবার কোথাও বা তা সর্বমুক্ত ব্যক্তিসত্তার জন্ম-জন্মান্তরের মধ্য দিয়ে মহাপ্রয়াণের ইঙ্গিতবহ (৭ সংখ্যক), কোথাও বা বিশ্বজাগতিক গতির বন্দনা (৮ সংখ্যক), কোথাও বা রাষ্ট্রীয় পঙ্কমুক্তির জন্য বিপ্লবের আহবান বাণী (৩৭সংখ্যক), কোনো কবিতায় মানুষের প্রতিনিধিরূপে কবির ঈশ্বরের প্রতি প্রেমের অর্ঘ্য প্রদান বা ফেলে আসা যৌবনের স্মৃতিচারণ প্রভৃতি। আপাতদৃষ্টিতে কবিতাগুলি বিচিত্র ও বিচ্ছিন্ন হলেও এমন একটি সামগ্রিক বক্তব্যকে ধারণ করে আছে যার সঙ্গে তুলনা চলে বলাকা পঙক্তির উড়ে চলার ব্যঞ্জনার। কবিতাগুলি বিচ্ছিন্নভাবে এক একটি বলাকা এবং সামগ্রিকভাবে গতিচেতনার বাণী বহনকারী চলমান বলাকা। এ কারণেই এ কাব্যের নামকরণ বলাকা সার্থক হয়েছে। যা শুধু গতির তত্ত্বকেই ব্যক্ত করে না, অপূর্ব সৌন্দর্যকেও প্রকাশ করে। সৌন্দর্যসত্তা ও গতিচেতনা ছাড়া এ গ্রন্থে আছে কবির মৃত্যুচেতনা ও শিল্পদর্শন।
আলোচ্য কাব্যের ভাবধৃত পঙক্তিগুলি সীমার বন্ধন ছিন্ন করে সব রকমের স্থিরতাকে আঘাত করে গতির আনন্দে কখনো দীর্ঘ ধারায় প্রবাহিত, কখনো সংযুক্ত চরণ থেকে সরে গিয়ে স্বাধীন, কোথাও বেগের আবেগে পরবর্তী চরণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ছন্দ-হিল্লোল সৃষ্টি করেছে। কোনে কোনো চরণ মুক্তির আনন্দে নিজে কেটে গিয়ে দ্বিধাবিভক্ত, আবার একটি বিশেষ আবেগে একটিমাত্র শব্দে একটি নতুন চরণের সৃষ্টি। এরকম অসমমাত্রিক ছন্দই বলাকা কাব্যের বৈশিষ্ট্য। বিচিত্র পঙক্তির সমন্বয়ে রচিত একটি স্তবক-
হে বিরাট নদী,
অদৃশ্য নিঃশব্দ তব জল
অবিচ্ছিন্ন অবিরল
চলে নিরবধি।
স্পন্দনে শিহরে শূন্য তব রুদ্র কায়াহীন বেগে;
বস্ত্তহীন প্রবাহের প্রচন্ড আঘাত লেগে
পুঞ্জ পুঞ্জ বস্ত্তফেনা উঠে জেগে;
আলোকের তীব্রচ্ছটা বিচ্ছুরিয়া উঠে বর্ণস্রোতে
ধাবমান অন্ধকার হতে;
ঘূর্ণাচক্রে ঘুরে ঘুরে মরে
স্তরে স্তরে
সূর্যচন্দ্রতারা যত
বুদবুদের মতো। (৮ সংখ্যক কবিতা)
এছন্দের বৈশিষ্ট্যকে  বোঝাতে গিয়ে কেউ কেউ ছন্দের এরূপ মুক্ত স্বভাবকে নাম দিয়েছেন ‘মুক্তক ছন্দ’ বা ‘মুক্তবন্ধ ছন্দ’। আবার কেউ কেউ এছন্দকে অমিত্রাক্ষর ছন্দেরই রবীন্দ্রনাথকৃত অভিনবরূপ বলে মনে করেন যা অন্ত্যানুপ্রাসযুক্ত। পাশ্চাত্য সাহিত্যে বহুল ব্যবহূত এছন্দকে free verse  বা verse-libre বলে।
এ কাব্যের ভাষা তীক্ষ্ণ, দীপ্ত, শাণিত ও উজ্জ্বল। এ কাব্যের ছন্দের গতিময়তা ও ভাষার সংহতি এবং নবতর বক্তব্যকে রূপ দেওয়ার কারণে এর আঙ্গিক একটি বিশিষ্টরূপ লাভ করেছে। এর আঙ্গিকের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য বৈপরীত্যের মধ্যে দিয়ে বক্তব্যকে তীক্ষ্ণ করে তোলা। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায়-রূপহীন মরণেরে মৃত্যুহীন অপরূপ সাজে/ যে মুহূর্তে পূর্ণ তুমি সে মুহূর্তে কিছু তব নাই/ মৃত্যুর অন্তরে পশি অমৃত না পাই যদি খুঁজে প্রভৃতি। বৈজ্ঞানিক-দার্শনিক গতিচেতনা  বিশেষ করে উপনিষদীয় গতিচেতনা এবং তাঁর সঙ্গে পৃথিবীর শোষিত-নিপীড়িত মানবের পক্ষাবলম্বনকারী মানবিক চেতনার সম্মিলনে তাঁর একাব্য গ্রন্থটি বিশিষ্টরূপ লাভ করেছে


মানসী কাব্য

আকাঙ্ক্ষা

      
আর্দ্র তীব্র পূর্ববায়ু বহিতেছে বেগে,
       ঢেকেছে উদয়পথ ঘননীল মেঘে।

       দূরে গঙ্গা, নৌকা নাই, বালু উড়ে যায়,

       বসে বসে ভাবিতেছিআজি কে কোথায়!

শূন্য হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষা


 আবার মোরে পাগল করে
             দিবে কে?

 হৃদয় যেন পাষাণ-হেন

        বিরাগ-ভরা বিবেকে।

আবার প্রাণে নূতন টানে
         প্রেমের নদী

পাষাণ হতে উছল স্রোতে
            বহায় যদি।

আবার দুটি নয়নে লুটি
        হৃদয় হরে নিবে কে?

আবার মোরে পাগল করে
             দিবে কে?

আত্মসমর্পণ


       আমি কেবল মিছে বলি,
       শুধু আপনার মন ছলি।

       কঠিন বচন শুনায়ে তোমারে

            আপন মর্মে জ্বলি।

       থাক্তবে থাক্ক্ষীণ প্রতারণা,

       কী হবে লুকায়ে বাসনা বেদনা,

       যেমন আমার হৃদয়-পরান

            তেমনি দেখাব খুলি।


নিষ্ফল কামনা


    বৃথা ক্রন্দন!
বৃথা অনল-ভরা দুরন্ত বাসনা!



            রবি অস্ত যায়।

অরণ্যেতে অন্ধকার আকাশেতে আলো।
             সন্ধ্যা নত-আঁখি

      ধীরে আসে দিবার পশ্চাতে।

বিচ্ছেদের শান্তি



     সেই ভালো, তবে তুমি যাও।
          তবে আর কেন মিছে করুণনয়নে

             আমার মুখের পানে চাও?

       চোখে ভাসিছে জল, শুধু মায়ার ছল,

              কেন কাঁদি তাও নাহি জানি।
চরিত্রায়নঃ স্বল্প সংখ্যক চরিত্রের সমবায়ে গঠিত এ কাব্যনাট্যে মাত্র দুটি চরিত্রই সর্বত্র প্রাধান্য বিস্তার করেছে। সে দুটি চরিত্র হচ্ছে কাহিনীর নায়ক ‘নৌফেল’ ও প্রতি নায়ক ‘হাতেম’। গ্রন্থের নামকরণে প্রকৃতপক্ষে দুটি চরিত্রের প্রাধান্যের স্বীকৃতি প্রকাশ পেয়েছে সবচেয়ে বেশি। দুটি চরিত্রের মধ্যে ‘নৌফেল’ চরিত্রাংকনেই ফররুখ আহমদের কৃতিত্ব প্রকাশ পেয়েছে বেশি। চরিত্র কোন বিশেষ ভাবনার নির্জীব প্রতীক মাত্র হয়ে দাঁডায়নি, সজীব মনুষ্য চরিত্রেরই মহিমা লাভ করেছে। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত নৌফেল একটি রক্তমাংশের তাজা মানুষ হয়েই দেখা দিয়েছে। বিপুল ঐশ্বর্য্য অতুল প্রতাপের অধিকারী নৌফেলের অদ্ভুত যশোলিপ্সা কিভাবে তাঁকে দারাজ-দিল হাতেম তা’য়ীর প্রতি ঈর্ষান্বিত করে তুলে ধাপে ধাপে পশুত্বের স্তরে নামিয়ে এনেছে, তা কবি সুক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের নৈপূন্যসহকারে প্রদর্শন করেছেন। 

কর্মের কুটিল পথ আশ্রয় করে বিষিয়ে তুলেছিলেন নিজের সমগ্র জীবনকে, নিজের অস্তিত্বকে করে তুলেছিলেন দুর্বিসহ হারিয়ে ফেলেছিলেন জীবনের প্রশান্তি, তা কবি অতি সুক্ষ্ম অন্তর্দৃষ্টি সহকারে বিশ্লেষন করে দেখিয়েছেন। তারপর কেমন করে নৌফেল মহৎ চরিত্রের ইশারা গ্রহণ করে জেগে উঠলেন জীবনের সুর্যালোকে তা কবি অতি সুন্দরভাবে দেখিয়েছেন। নৌফেলের অন্তর্দ্বন্দ্বের বর্ণনায় জীবন শিল্পী ফররুখ যথেষ্ট কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। মোট কথা, এ চরিত্রাংকনে ফররুখ ঔপন্যাসিক ও নাট্যকার সুলভ বাস্তব দৃষ্টির সাথে কবি সুলভ সুক্ষ্ম অন্তর্দৃষ্টির পরিচয় দিয়েছেন বলতেই হয়। 

তুলনামূলকভাবে, হাতেম চরিত্রাংকনে ফররুখ তেমন কোন স্বার্থকতা লাভ করতে পারেন নি, হাতেম চরিত্র একটা আদর্শের নির্জীব প্রতিমূর্তি হয়ে দেখা দিয়েছে। তাকে কখনই রক্তমাংশের মানুষের মত বাস্তব বলে বোধ হয় না। লক্ষ করার বিষয়, নাটকে হাতেম চরিত্র প্রায়শঃই নেপথ্যাশ্রয়ী। লোকমুখে ভেসে আসে তাঁর সুখ্যাতির কথা আর তাই আমাদের মনের কোণে উজ্জ্বল বিভায় মূর্ত করে তোলে এক সেবাব্রতী মানব বন্ধু রুপকে। নৌফেল তাঁর সৌভাগ্য ও সুনামের কাল্পনিক প্রতিবাদীকে চোখে বড় একটা দেখেননি, যখন দেখতে পেলেন তখন তিনি হয়ে দাঁডালেন রাহুমুক্ত চাঁদের মত মনুষত্বের বিভায় উজ্জ্বল। 

এ নাটকে আমরা তাঁর স্বাক্ষাতকার পাই মাত্র চারটি দৃশ্যে, একবার নৌফেলের ইয়েমেন মুল্লুক আক্রমণের পূর্বমূহুর্তে বৃদ্ধ বাদশাহ তায়ীর সাথে কথোপকথনরত অবস্থায়, একবার প্রাচীন কোন শহরের রাজপথে রুগ্ন গরীব এক মুটের বোঝা বহনরত অবস্থায়, একবার নৌফেলের রাজ্যে বনপথে কাঠুরিয়া পরিবারের সাথে সাক্ষাত এবং সর্বশেষ বৃদ্ধ কাঠুরিয়ার বন্দী হিসেবে নৌফেলের দরবারে কাঠুরিয়াকে বিঘোষিত পুরস্কার দেবার জন্য অনুরোধ করতে। সর্বত্রই লক্ষ্য করা যায় তিনি ত্যাগ, ক্ষমা, স্নেহ, প্রেম, সেবা, ভালোবাসা দিয়ে মানুষের হৃদয় জয়ের সাধনায় রত। দীন-দুনিয়ার কল্যাণ ছাড়া জীবনের তার অন্য কোন ভাবনা নাই। তিনি স্নেহ, প্রেম, ভালবাসা, করুণায় বিগলিত চিত্ত একট অতি সুন্দর মানুষ। সেবা ধর্মের মহিমায় তাঁর অটল বিশ্বাস। শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে তিনি সকলের জন্য বোধ করেন মমত্ব। সামান্যতম বিরুপতা জাগেনা তার মনে প্রাণে কারও সম্পর্কে। নৌফেল তাঁকে রাজ্য ছাড়া গৃহহারা করেছেন, তাকে হত্যা করার চেষ্টা করেছেন, তার পরিবর্তে হাতেম শুনিয়েছেন তাঁকে প্রেম ও কল্যাণের বাণী। যে খ্যাতির জন্যে তাঁর বিরুদ্ধে নৌফেলের সংগ্রাম সে সংগ্রামেও হাতেম নির্বিকার। 

হাতেম এক অটল অনড় আদর্শ বিশ্বাসী মানুষ। আলোচ্য নাটকে তিনি যেন সব মানবিক সদগুণেরই যেন একটি প্রতিমূর্তিরুপে উপস্থিত। কোন মানবিক দূর্বলতা ও বিকার এ চরিত্রে লক্ষ্য করা যায় না। হাতেম চরিত্র তাই যেন একটা আইডিয়া রুপেই এই নাটকে দেখা দিয়েছে। ঠিক রক্তমাংশের মানুষ রুপে দেখা দেয়নি। চরিত্রটি নিঃসন্দেহে একমাত্রিক তাই অতিমানবীয়। 

এ কাব্যনাট্যে কবি বোধ হয় সর্বাধিক কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন অতি সাধারণ স্তরের নরনারীর চরিত্র চিত্রনে। স্বল্পাক্ষরে অংকিত এ চরিত্রগুলোর মুখে তিনি যে প্রাণবন্ত সংলাপ জুড়ে দিয়েছেন তাতেই এরা জীবন লাভ করেছে। প্রসঙ্গত গুপ্তচর, মূটে, বৃদ্ধ কাঠুরিয়া ও তার স্ত্রী পুত্রাদির চরিত্রগুলোর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। উজীর, সিপাহ সালার, আমীর, শায়ের, ভাঁড়, মোসাহেব, ইয়েমেনের বৃদ্ধ বাদশাহ ইত্যাদি চরিত্র বিশেষত্ব বর্জিত। মুর্শিদের সত্যনিষ্ঠ চরিত্রের দৃঢ়তাজ্ঞাপক মুর্তিটে অবশ্য মন্দ হয়নি। 

নারী চরিত্রের প্রায় অনুপস্থিতি এ নাটকের আরেকটি লক্ষনীয় বৈশিষ্ট্য। একমাত্র নৌফেল বাদশাহর বেগম চরিত্রটি ছাড়া উল্লেখযোগ্য নারী চরিত্র এ নাটকে নাই বললেই চলে। তাও আবার বেগম চরিত্রটির ভূমিকা নিতান্তই গৌণ এবং অনুল্লেখযোগ্য। নাটকের নায়ক চরিত্রের বিবর্তনে তাঁর একটি ক্ষুদ্র ভূমিকা আছে, শুধু এটুকু আমরা তাঁর সম্পর্কে নিশ্চিত করে বলতে পারি। তবে মুলতঃ নেপথ্যাশ্রয়ী চরিত্রের ভুমিকাই সে পালন করেছে। 

নৌফেল ও হাতেম

নৌফেল হাতেম কোনো গতানুগতিক কাব্যনাট্য নয়। এটি স্থান পেয়েছে বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ-সফল কটি কাব্যনাটকের তালিকায়। ভাষা, শব্দ, ছন্দ, কাব্য-ঐশ্বর্যের সঙ্গে নাট্যগুণ, পঠিতব্যতা অভিনয়-উপযোগিতা ইত্যাদি বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে কাব্যনাটকটির শিল্পমূল্যের স্বীকৃতি দিয়েছিলেন সমকালের প্রায় সকলেই সোৎস্ফুর্তভাবে। কাব্যনাটকটির কাহিনিসূত্র খুব স্বল্পপরিসর, সামান্য সাধারণ। কিন্তু তিনি সামান্যোর মধ্যে অসমান্যকে, সাধারণের মাঝে অসাধারণকে ধারণ করতে পেরেছেন কবিপ্রতিভার শক্তি দিয়ে। স্বল্পসূত্র কাহিনী দিয়ে তিনি সৃষ্টি করেছেন তিনি অঙ্কে প্রায় পনেরটি চরিত্র। নাটকের মূলবক্তব্য: পঙ্গুত্ব থেকে মনুষত্বের দিকে ধাবন, মহত্তম মাবতার উজ্জীবন। হিংসা-বিদ্বেষ, জুর-জুলুম, অহঙ্কার-অত্যাচার, যশলি≈v-উচ্চাভিলাষ ইত্যাদির মতো হীনকর্ম পরিত্যাগ করে প্রেম-ভালবাসা, ত্যাগ-পরোকার, বিনয়-ন্যায়, যশবিমুখতা উদারতার দিকে প্রত্যাবর্তন।
ফররুখ আহমদের -কাব্যনাটকে আদর্শের সঙ্গে জৈবিক বাস্তবতার সঙ্ঘাত, ব্যক্তিক অসৎ মানসিকতার সঙ্গে সামাজিক সৎ মানসিকতার দ্বনদ্ব এবং লোভ-মোহের পরিবর্তে ত্যাগ, বিনয় সেবাব্রতের জয় শিল্পকৌশলে চিত্রিত হয়েছে। কবি এই নাট্যকাহিনীতে যশখ্যাতির প্রতি মানুষের মোহ এবং যাবতীয় কূটকৌশল অবলম্বন করেও তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ক্ষোভ বা আকাক্মিখত কোনো কিছুর অপ্রাপ্তির মুখে প্রতিশোধস্পৃহা কতটা হিংসাত্মক হয়ে উঠতে পারে, তা নৌফেল চরিত্রে প্রকাশ করেছেন। মানবতার বিপর্যয়, পশুত্বের কাছে মনুষত্বের পরাজয়, মানবত্মার ক্রন্দন, মানুষের বিকেপতন কবিতে পীড়িত করেছে ভীষণভাবে। তাকে ব্যথিত করেছে মানুষের নীচতা-হীনতা। তারপরও মানুষের প্রতি মানবতার প্রতি তার বিশ্বাস লুপ্ত হয় নি, ক্ষয়ে পড়ে নি। তিনি স্বপ্ন দেখেছেন মুক্তি সুষ্ঠু বিকাশ, জড়ত্বের দাসত্ব থেকে মুক্তির আকুতিই কবিতার শিল্পরূপে উপস্থাপিত হয়েছে শব্দ-ছন্দের গাথুনিতে, চিন্তার বুনুনিতে, বলার ভঙ্গিতে সঙ্গীতে। আর এই মানসবৃক্ষের মিষ্ট ফল হিসেবে আমরা পেয়েছি নৌফেল হামের মতো একটি অবনদ্য কাব্যনাট্য।
নৌফেল সর্বস্ব বিলানোর পরও হাতেমের মতো যশ খ্যাতি অর্জনে ব্যর্থ হয়ে হাতেমের রাজ্যলুটের অভিপ্রায় ব্যক্ত করে অত্যন্ত নীচু মানুসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। তথাপি একথা সত্য যে, মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রাপ্তি না ঘটলে, তার মনে প্রতিহিংসার আগুন জ্বলে ওঠে। তার প্রতিটি স্নায়ু-কোষে জ্বলে ওঠে জাহান্নাম। তার অতন্দ্র রাত শেষ হয় তীব্র বিষে। তিক্ত বিষ সয়ে-সয়ে চলে তার জীবন-যৌবন। নৌফেলের ক্ষেত্রে তাই হয়েছে। সে অহঙ্কারি, অত্যাচারি, ক্ষমতালোভী প্রতিহিংসাপরায়ণ। তার ক্ষোভাগ্নিভরা কণ্ঠ চিরে তাই বের হয়ে পড়ে,
আমাকে দিওনা বাধা।  প্রতি রন্ধে, প্রতি স্নায়ু-কোষে
জ্বলে কোন জাহান্নাম রাত্রিদিন, তুমি তা জানো না।
আমার অতন্দ্র রাত্রি শেষ হয় কোন তীব্র বিষে
জানো না তুমি; কেউ তা জানে না। তবু আমি
আপ্রাণ চেষ্টার সেই তিক্ত বিষ সয়েছি জীবনে
দীর্ঘকাল। ভেবেছি অহেতু আমি আত্মপ্রতারিত
নৌফেল হাতেমের যশখ্যাতিকে ভস্ম করে নিজে খ্যাতিমান হয়ে ওঠার যাবতীয় কলাকৌশল করে দেখেন। কিন্তু পরীক্ষায় সে ফেল মারে। সব অস্ত্র সে ব্যবহার করে দেখেছে। কিন্তু কোনো অস্ত্র তার লক্ষ্য ভেদ করতে পারেনি। এখন তার হাতে একটিমাত্র অস্ত্র: ক্ষমতার শক্তি প্রয়োগ করে, কাট-কাট-মার-মার শব্দ তুলে লুটতরাজ করা, অন্যদেশে অন্যায় হানা দেয়া, অতর্কিতে হামলে পড়া এবং নিরপরাধ ব্যক্তিদের দিয়ে বন্দীশালা ভর্তি করা। সেই আখেরী অস্ত্রটিও ব্যবহার করতে ভুলে যায় নি নৌফেল।  তাই সে ক্ষোভঝরা কণ্ঠে হুঙ্কার ছাড়ে,

....প্রয়াসী আমার
মেলে সে খ্যাতি যশ সর্বস্ব বিলিয়ে; ঘৃণা আমি
পাই প্রতিদানে। কুড়াই কুখ্যাতি শুধু। তাই আমি